পৃথিবীতে অনেক অভিনেতা আছেন, যারা শুধু অভিনয় করেই প্রচুর টাকা কামান। কিন্তু সেই টাকাকে যদি আপনি ব্যবসায় পরিণত করতে না পারেন, তাহলে সেটা একদিন শেষ হয়ে যাবে। যারা বুঝেছেন এই হিসাবটা, তারাই আসল সাম্রাজ্য গড়েছেন। বলিউডে সেই তালিকার একেবারে শীর্ষে যাঁর নাম, তিনি শাহরুখ খান।
টেলিভিশনের অভিনেতা হিসেবে যিনি ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, আজ তিনি প্রায় ১০ হাজার কোটি রুপি বা ১৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকার মালিক। হুরুন ইন্ডিয়ার ২০২৬ সালের হিসাব বলছে এই কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিপুল সম্পদ কীভাবে তৈরি হলো? শুধু কি সিনেমার পারিশ্রমিক? না। গল্পটা অনেক বড়।

শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ
১৯৬৫ সালের ২ নভেম্বর দিল্লিতে জন্ম শাহরুখের। বাবা মীর তাজ মোহাম্মদ খান ছিলেন ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী, মা লতিফ ফাতিমা ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট। দিল্লির সেন্ট কলম্বাস স্কুলে পড়াশোনা শেষে হংসরাজ কলেজে ভর্তি হন। পরে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় গণযোগাযোগ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও অভিনয়ের টানে সেটা শেষ করেননি। থিয়েটার আর টেলিভিশনে কাজ করতে করতেই বড় পর্দার স্বপ্নটা তৈরি হয়।
১৯৯১ সালে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান। পরের বছর ‘দিওয়ানা’ দিয়ে বড় পর্দায় পরিচিতি পান। তখন কি কেউ ভেবেছিলেন, এই অভিনেতাই একদিন বিশ্বের অন্যতম ধনী অভিনয়শিল্পী হয়ে উঠবেন?
শুধু পারিশ্রমিক নয়, লাভের অংশীদারও
নব্বইয়ের দশকে ‘বাজিগর’, ‘ডর’, ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’, ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’—একটার পর একটা হিট ছবি। তারকাখ্যাতি বাড়ল, পারিশ্রমিকও বাড়ল। কিন্তু অন্য অনেক তারকার মতো শাহরুখ শুধু নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকে সন্তুষ্ট থাকেননি। তিনি ছবির লাভের অংশীদার হওয়ার কৌশল নেন। অর্থাৎ ছবি ভালো ব্যবসা করলে সেখান থেকেও আয়। ‘পাঠান’ আর ‘জওয়ান’-এর মতো ব্লকবাস্টার এই কৌশলের আর্থিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। অভিনয়ের এই আয়ই পরে ব্যবসায় বিনিয়োগের পুঁজি হয়ে ওঠে।
প্রথম ব্যবসায় ধাক্কা, কিন্তু থামেননি
১৯৯৯ সালে জুহি চাওলা আর পরিচালক আজিজ মির্জার সঙ্গে মিলে গড়েন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ড্রিমজ আনলিমিটেড। প্রথম ছবি ‘ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’ (২০০০) বক্স অফিসে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এরপর ‘অশোকা’ (২০০১)-ও ব্যবসায়িকভাবে বড় সাফল্য পায়নি। পরপর দুই ছবির ব্যর্থতায় আর্থিক চাপ তৈরি হয়। তবে এখানেই থেমে যাননি শাহরুখ। ২০০৩ সালে ‘চলতে চলতে’ তুলনামূলক ভালো ব্যবসা করে।
রেড চিলিজ: সাম্রাজ্যের মূল ভিত্তি
ড্রিমজের অভিজ্ঞতার পর নিজের ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে আরও বিস্তৃত করেন শাহরুখ। ২০০২ সালে গড়ে ওঠা রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট ধীরে ধীরে তাঁর সাম্রাজ্যের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। স্ত্রী গৌরী খানও এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
২০০৪ সালে ‘ম্যায় হু না’ ছিল প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা। এরপর ‘ওম শান্তি ওম’, ‘বিল্লু’, ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’, ‘দিলওয়ালে’, ‘রইস’, ‘জওয়ান’—একটার পর একটা ছবি। কিন্তু রেড চিলিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি শুধু সিনেমা তৈরির প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকেনি। চলচ্চিত্রের স্বত্ব, পরিবেশনা, ডিজিটাল কনটেন্ট, পোস্ট-প্রোডাকশন — সবদিকে বিস্তৃত হয়েছে এর কাজ। ফলে একটি সিনেমা মুক্তির পরও তার স্বত্ব ও বাণিজ্যিক ব্যবহার থেকে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ শাহরুখের সম্পদ তৈরির পেছনে শুধু অভিনয় নয়, সিনেমার মালিকানা ও ব্যবসায়িক অধিকারও বড় ভূমিকা রেখেছে।
ভিএফএক্সেও বিনিয়োগ
সিনেমার পেছনের প্রযুক্তিটাও যে বড় ব্যবসা হতে পারে, সেটা শাহরুখ বুঝেছিলেন। রেড চিলিজের অধীনে গড়ে তোলেন রেড চিলিজ ভিএফএক্স। ‘রা.ওয়ান’, ‘কৃষ থ্রি’, ‘ফ্যান’, ‘জিরো’সহ বিভিন্ন সিনেমায় ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের কাজ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সিনেমাতেও কাজ করেছে। এখানে তাঁর দূরদর্শিতার একটা দিক স্পষ্ট — তিনি শুধু নিজের সিনেমার জন্য অর্থ ব্যয় করেননি, সেই সিনেমা তৈরির প্রযুক্তি ও দক্ষতাকেও ব্যবসায়িক সম্পদে পরিণত করেছেন।
ক্রিকেটে বাজি: কলকাতা নাইট রাইডার্স
সম্পদ বৃদ্ধির গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগগুলোর একটা ক্রিকেট। ২০০৮ সালে আইপিএলের প্রথম আসরের আগে জুহি চাওলা ও তাঁর স্বামী জয় মেহতার সঙ্গে মিলে কলকাতা নাইট রাইডার্স কেনেন। সে সময় প্রায় ২৬২ কোটি রুপি বিনিয়োগের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
শুরুর দিকে কেকেআরের পারফরম্যান্স ভালো ছিল না। প্রথম তিন আসরে দলটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু বিনিয়োগ থেকে সরে আসেননি শাহরুখ। ২০১২ সালে প্রথমবার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয় কলকাতা। ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বার। ২০২৪ সালেও চ্যাম্পিয়ন হয় কেকেআর। শুধু তা-ই না, ক্যারিবীয় প্রিমিয়ার লিগের ত্রিনবাগো নাইট রাইডার্স, যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ ক্রিকেটের লস অ্যাঞ্জেলেস নাইট রাইডার্স — বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে নাইট রাইডার্স ব্র্যান্ড।
বিজ্ঞাপনে আলাদা বাজার
শাহরুখের সম্পদের আরেকটা বড় উৎস বিজ্ঞাপন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশি-বিদেশি নানা প্রতিষ্ঠানের পণ্যের দূত হিসেবে কাজ করছেন। গাড়ি, ঘড়ি, পানীয়, প্রযুক্তিপণ্য, ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ — কোনো খাত বাদ নেই। এখানে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি জনপ্রিয়তা। ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ — সবখানেই তাঁর ভক্ত আছে। ফলে একটি বিজ্ঞাপনে তাঁর উপস্থিতি শুধু ভারতীয় বাজারেই প্রভাব ফেলে না, আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পৌঁছায়। ২০২৫ সালের হিসাবে শাহরুখের ব্র্যান্ডমূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৬৯৪ কোটি রুপি।
মান্নাত থেকে দুবাই: আবাসনেও বিনিয়োগ
সম্পদের আলোচনায় তাঁর বাড়িগুলোর কথা না বললেই নয়। মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা মান্নাত শুধু তাঁর বাড়ি নয়, ভক্তদের কাছে একটা দর্শনীয় স্থান। একসময় এই বাড়ির নাম ছিল ভিলা ভিয়েনা। পরে শাহরুখ এটি কিনে সংস্কার করেন। স্ত্রী গৌরী খান বাড়িটির অভ্যন্তরীণ নকশায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এ ছাড়া দুবাইয়ের পাম জুমেইরায় তাঁর বিলাসবহুল ভিলা আছে। লন্ডন ও ভারতের আলিবাগেও সম্পত্তি থাকার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
পরিবারও ব্যবসার অংশীদার
শাহরুখের সাম্রাজ্যের আরেকটা দিক হলো পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা। স্ত্রী গৌরী খান শুধু জীবনসঙ্গী নন, ব্যবসারও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। রেড চিলিজের পাশাপাশি নিজের ইন্টেরিয়র ডিজাইনের প্রতিষ্ঠানও পরিচালনা করেন তিনি। ছেলে আরিয়ান খানও বিনোদন ব্যবসায় যুক্ত। ২০২৫ সালে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য বার্ডস অব বলিউড’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন তিনি। মেয়ে সুহানা খানও অভিনয়ে এসেছেন। অর্থাৎ পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মও যুক্ত হচ্ছে বিনোদনশিল্পের সঙ্গে।
শেষ হিসাবটা কী বলছে?
হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট ২০২৬ অনুযায়ী, শাহরুখ খানের মোট সম্পদের আনুমানিক পরিমাণ ১০ হাজার কোটি রুপি। এই হিসাব তাঁকে ভারতের সবচেয়ে ধনী অভিনেতার জায়গায় রেখেছে। তালিকায় তাঁর পরেই অমিতাভ বচ্চন, যাঁর সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ৪ হাজার কোটি রুপি।
তবে মজার বিষয় হলো, ২০২৫ সালের হুরুন তালিকায় শাহরুখের সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল ১২ হাজার ৪৯০ কোটি রুপি। নতুন তালিকায় তা কমেছে প্রায় ২ হাজার ৪৯০ কোটি রুপি।
তাহলে বুঝলেন তো? শুধু অভিনয় করে টাকা কামানো আর সেই টাকাকে ব্যবসায় পরিণত করা — দুটো আলাদা জিনিস। শাহরুখ খান দ্বিতীয়টা করেছেন বলেই আজ তিনি শুধু বলিউডের বাদশাহ নন, বিনোদনজগতের এক সাম্রাজ্যের সম্রাট। আপনিও যদি স্বপ্ন দেখেন, তাহলে শুধু প্রতিভা নিয়ে বসে থাকবেন না। প্রতিভাকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করুন। কারণ সাফল্য শুধু প্রতিভার উপর নির্ভর করে না, সঠিক পরিকল্পনার উপরও নির্ভর করে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস ও টাইমস অব ইন্ডিয়া।