রূপালি পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল প্রেক্ষাগৃহভর্তি দর্শকের করতালির শব্দ আর হাসির রোল। ঢালিউডের ইতিহাসে এমন একজন অভিনেতা ছিলেন, যিনি কোনো সিনেমার মূল নায়ক না হয়েও কেবল নিজের নিখাদ কৌতুক অভিনয়ের জোরে কোটি মানুষের দিল জয় করেছিলেন। তিনি আর কেউ নন—আমাদের সবার প্রিয় দিলদার। ঢাকাই সিনেমার তুমুল জনপ্রিয় এই অভিনেতা আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু দর্শকের স্মৃতিতে তিনি বেঁচে আছেন এক চিরসবুজ বিনোদনের প্রতীক হয়ে। আজ ১৩ জুলাই, এই মহান কৌতুক সম্রাটের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুর দুই দশক পেরিয়েও ঢাকাই সিনেমায় তাঁর বিকল্প আজও তৈরি হয়নি।

যখন দিলদারের লিপে গান মানেই ছিল অবধারিত হিট!
বাংলা সিনেমার ইতিহাসে দিলদার এমন একজন বিরল কৌতুক অভিনেতা ছিলেন, যাঁকে সিনেমার মূল কাহিনীর অন্যতম চালিকাশক্তি মনে করা হতো। পরিচালকেরা তাঁকে এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে, সে সময়কার সিনেমার নায়ক-নায়িকার পাশাপাশি দিলদারের লিপেও আলাদা গান রাখা হতো। আর সেই গানগুলো রেডিও-টেলিভিশনে তুমুল ঝড় তুলত।
দিলদার অভিনীত ও তাঁর লিপে ঠোঁট মেলানো উল্লেখযোগ্য কিছু কালজয়ী গানের তালিকা:
- ‘কী করে বলব তোমায়’
- ‘হাজার টাকার বাগান খাইবো’
- ‘যদি সুন্দর একখান বউ পাইতাম’
- ‘তোর পিরিতের এত ঝাল, উঠে গেছে পিঠের ছাল’
- ‘ও সরকার একটা চাকরির খুব দরকার’
- ‘আমি একটা আমগাছ’ ও ‘আমার চেহারা জাপানি, করি না আমি ফুটানি’
কৌতুক চরিত্রের বাইরে: ‘আবদুল্লাহ’ সিনেমার সেই নায়ক দিলদার
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে দিলদার নিজেকে শুধু পাশ্ববর্তী কৌতুক চরিত্রেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর প্রতিভার সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ ঘটেছিল তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ‘আবদুল্লাহ’ সিনেমায়। এই সিনেমায় তিনি নাম ভূমিকায় (নায়ক হিসেবে) অভিনয় করেন এবং তাঁর বিপরীতে নায়িকা ছিলেন গুণী অভিনেত্রী নূতন। সিনেমাটিতে দিলদারের সিরিয়াস ও আবেগঘন অভিনয় তৎকালীন চলচ্চিত্র অঙ্গনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং বক্স অফিসেও দারুণ সফল হয়েছিল।
মাত্র ২০ বছর বয়সে অভিষেক ও তিন দশকের রাজত্ব
১৯৪৫ সালের ১৩ জানুয়ারি চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন দিলদার। ১৯৬৫ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে ‘কেন এমন হয়’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রুপালি পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। এরপর টানা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ঢাকাই সিনেমা পাড়া মাতিয়ে রেখেছিলেন।
চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’। পর্দায় সব সময় হাস্যোজ্জ্বল, চটপটে ও প্রাণবন্ত থাকলেও, পর্দার আড়ালের ব্যক্তি দিলদার ছিলেন বেশ দৃঢ়চেতা, নীতিবান ও জেদি স্বভাবের একজন মানুষ।
দিলদারের কিছু স্মরণীয় চলচ্চিত্র
তাঁর অভিনীত কয়েকশত সিনেমার মধ্যে ‘বেদের মেয়ে জোছনা’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘গুণ্ডা নাম্বার ওয়ান’, ‘শান্ত কেন মাস্তান’ এবং ‘খাইরুন সুন্দরী’ অন্যতম।
শেষ কথা: ঢালিউডের এক অপূরণীয় শূন্যতা
২০০৩ সালের ১৩ জুলাই, মাত্র ৫৮ বছর বয়সে এই হাসির রাজা আমাদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তিনি চলে যাওয়ার পর ঢাকাই সিনেমায় কমেডি বা কৌতুক ঘরানায় যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা আজও পূরণ হয়নি। বর্তমানের যান্ত্রিক যুগেও যখন দর্শক ক্লান্তি দূর করতে একটু হাসতে চান, তাঁরা ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়ায় খুঁজে বেড়ান ‘বেস্ট অব দিলদার’। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়েও তিনি আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন ঢালিউডের শ্রেষ্ঠ কমেডি কিং হয়ে।