আর্জেন্টিনা গোল করেছে দুটি। একটি এনজো ফার্নান্দেজ, অন্যটি লাওতারো মার্তিনেজ। গোলদাতার তালিকায় তাঁর নাম নেই। তবু ফুটবলবিশ্বের সবাই একবাক্যে স্বীকার করছেন, সেমিফাইনালে পরাশক্তি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আলবিসেলেস্তেদের রূপকথার মতো ঘুরে দাঁড়ানো আর জয়ের একমাত্র মহাকাব্যিক নায়ক লিওনেল মেসিই। ম্যাচের ৫৫ মিনিট পর্যন্ত তাঁকে প্রায় বোতলবন্দি করে রেখেছিল থ্রি লায়ন্সরা। কিন্তু এরপর যা হলো, তা যেন এক জাদুকরের হাত ধরে পুরো ম্যাচের চিত্রনাট্য ও ভাগ্য বদলে যাওয়ার গল্প। টমাস টুখেলের দল হয়তো ম্যাচ শেষে স্কোরলাইন দেখেছে ২–১; কিন্তু মাঠের ভেতরে তারা আসলে হেরে গেছে ৩৯ বছর বয়সী এক অতিমানবীয় মেসির কাছেই!

৩৯ বছর বয়সে প্রথম দেখা: ইংলিশদের জন্য এক দুঃস্বপ্ন
ক্যারিয়ারে এর আগে কখনো ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হননি মেসি। তাঁর অভিষেকের পর আর্জেন্টিনা যে একবার (২০০৫ সালে) ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল, সেদিন তিনি লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞায় মাঠে থাকতে পারেননি। অবশেষে কাতার ও আমেরিকার পর ২০২৬ সালের এই মহামঞ্চে এসে প্রথম দেখায় ইংলিশদের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা হলো, এমন কিছু নিশ্চয়ই চিরকাল ভুলে যেতে চাইবে হ্যারি কেইনের দল।
প্রথমার্ধে মেসিকে মাঝমাঠেই আটকে রেখেছিল ইংল্যান্ড। বল পেলে কয়েকটি চমৎকার টাচ দেখিয়েছেন, কিন্তু ম্যাচে তাঁর চেনা প্রভাব চোখে পড়ার মতো ছিল না। ইংল্যান্ডও খেলছিল একদম নিখুঁত পরিকল্পনামাফিক। ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের চোখ ধাঁধানো গোলে যখন ইংল্যান্ড এগিয়ে যায়, তখনই আসলে দিক বদলাতে শুরু করে ম্যাচের মূল স্রোতোধারা।
স্কালোনির এক মাস্টারস্ট্রোক এবং টুখেলের বুমেরাং কৌশল
গোল হজম করার পর আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির কৌশল না পাল্টে উপায় ছিল না। তিনি এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু অসামান্য সিদ্ধান্ত নিলেন — মেসিকে মাঝমাঠ থেকে সরিয়ে মাঠের ডান দিকের উইংয়ে পাঠিয়ে দিলেন। স্কালোনির এই একটি চালই ইংল্যান্ডের পুরো রক্ষণ-পরিকল্পনার দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দেয়। ম্যাচ শেষে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজও স্বীকার করেছেন, “মেসিকে উইংয়ে নিয়ে আসাটাই ছিল আমাদের জন্য ম্যাচের আসল টার্নিং পয়েন্ট।”
ওদিকে ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেল তখন ম্যাচ বাঁচাতে রক্ষণ আরও শক্ত করতে অতিরিক্ত ডিফেন্ডার নামাতে শুরু করেন। উদ্দেশ্য ছিল এগিয়ে থাকা স্কোরলাইন ধরে রাখা; কিন্তু সেটিই উল্টো বুমেরাং হয়। ইংল্যান্ড ক্রমেই নিজেদের বক্সে গুটিয়ে যায়, আর ম্যাচের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আর্জেন্টিনার পায়ে।
পরিসংখ্যানের অবিশ্বাস্য চিত্র: ম্যাচের ৫৫ থেকে ৯২ মিনিটের মধ্যে ৮৮ শতাংশ বলের দখল ছিল আর্জেন্টিনার কাছে! এর মধ্যে ৬৬ থেকে ৮৪ মিনিট, এই ১৮ মিনিটে পুরো ইংল্যান্ড দল মাত্র ২টি সঠিক পাস দিতে পেরেছিল। আর সেই দুটি পাসও ছিল গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ড ও সেন্টারব্যাক জন স্টোনসের একে অপরকে দেওয়া ফিরতি পাস!
এক মেসি বনাম পুরো ইংল্যান্ড দল!
মূলত এই সময়টাতেই ম্যাচের নাটাই নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন মহাতারকা মেসি। বল পেলেই তিনি একজন, দুজন, কখনো তিনজন ইংলিশ ফুটবলারকে চুম্বকের মতো নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন। ডান প্রান্ত থেকে কখনো কাট-ইন করে ভেতরে ঢুকেছেন, কখনো বক্সের সামনে এসে জায়গা তৈরি করেছেন, আবার কখনো এমন সব পাস দিয়েছেন যা পুরো ইংলিশ ডিফেন্সকে এলোমেলো করে দিয়েছে।
সংখ্যার বিচারেই স্পষ্ট হয়ে যায় সেই মুহূর্তে ইংল্যান্ড কতটা অসহায় ছিল:
- সফল ড্রিবল: ম্যাচে একাই মেসির সফল ড্রিবল ছিল ৯টি, যেখানে পুরো ইংল্যান্ড দল মিলে করতে পেরেছে মাত্র ৭টি!
- বক্সে টাচ ও সুযোগ তৈরি: ইংল্যান্ডের বক্সে মেসির একার টাচ ছিল ৭টি এবং গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ৪টি, যা আক্ষরিক অর্থেই পুরো ইংলিশ স্কোয়াডের সম্মিলিত পারফরম্যান্সের সমান!
- ক্রস: ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ৯টি নিখুঁত ক্রসও এসেছে তাঁর ম্যাজিকাল লেফট ফুট থেকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, আর্জেন্টিনার দুটি গোলের পেছনেই ছিল তাঁর জাদুকরী অবদান। ৮৫ মিনিটে কর্নার থেকে মেসির বাড়ানো বল পেয়ে দূরপাল্লার বুলেটের মতো শটে সমতা ফেরান এনজো ফার্নান্দেজ। এরপর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে (৯২ মিনিট) মেসির নিখুঁত ক্রস থেকেই হেডে জয়সূচক গোলটি করেন লাওতারো মার্তিনেজ।
‘সে মাঠে হেঁটে বেড়ায়, কিন্তু বল পেলেই তালা খোলার চাবি তার কাছে থাকে’
মেসির এই ‘হেঁটে বেড়ানো’ নিয়ে ফুটবল বিশ্বে আলোচনা নতুন নয়। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতেই যে তিনি প্রতিপক্ষের অবস্থান পড়েন এবং ঠিক মুহূর্তে বিষাক্ত ছোবল মারেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেটিই আবার প্রমাণিত হলো। ইংল্যান্ডের সাবেক গোলকিপার জো হার্টের বিশ্লেষণ, “আমরা ডিফেন্স লক করে রাখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তাতে করে মেসি পুরোপুরি স্বাধীন হয়ে যায়। আর সেই তালা খোলার চাবি তো তাঁর কাছেই ছিল। শেষ ১৫ মিনিট সে একাই ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে।”
ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনও ম্যাচ শেষে হতাশা লুকিয়ে রাখতে পারেননি, “আমরা দীর্ঘ সময় ওকে ভালোভাবেই আটকে রেখেছিলাম। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে যা হয়, বল পেলেই তারা নতুন কিছু তৈরি করতে পারে। এমনি এমনি তো তিনি ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় হননি।”
শেষ কথা: মহিমান্বিত এক ফুটবল নেতা
৩৯ বছর বয়সে এসেও যেভাবে লিওনেল মেসি একা হাতে একটি আন্তর্জাতিক সেমিফাইনালের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিলেন, তা কেবল তাঁর ফুটবল প্রতিভার প্রমাণ নয়, বরং তাঁর অনন্য মানসিক দৃঢ়তার প্রতীক। গোল না করেও কীভাবে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হওয়া যায়, ফুটবল ইতিহাসে তা আরও একবার দেখালেন এই আর্জেন্টাইন জাদুকর। আর এই অবিশ্বাস্য জয়ের হাত ধরেই আর্জেন্টিনা পৌঁছে গেল আরেকটি সোনালী ট্রফির দোড়গোড়ায়।