সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে শুধু নারীর নয়, পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দম্পতির দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সন্তান না হলে অনেক সময় শুধু নারীকেই দায়ী করা হয়। অথচ বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বন্ধ্যত্বের পেছনে পুরুষের কারণও উল্লেখযোগ্য। শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া, এর গুণগত মানের সমস্যা কিংবা শুক্রাণু চলাচলের পথে বাধা— বিভিন্ন কারণে পুরুষের বন্ধ্যত্ব হতে পারে।

পুরুষের বন্ধ্যত্ব কী?
এক বছর বা তার বেশি সময় নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণ ছাড়া যৌনসম্পর্কের পরও সন্তান ধারণ না হলে তাকে বন্ধ্যত্ব বলা হয়। এ ক্ষেত্রে সমস্যাটি নারী বা পুরুষ যেকোনো একজনের কিংবা উভয়ের হতে পারে।
পুরুষের ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সংখ্যা, চলনক্ষমতা ও গঠন পরীক্ষা করে প্রজননক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়। প্রতি মিলিলিটারে শুক্রাণুর সংখ্যা ১৫ মিলিয়নের কম হলে স্বাভাবিকভাবে সন্তান ধারণে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে।
শুক্রাণু কমে যাওয়ার কারণ
পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমন—
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: শরীরে প্রয়োজনীয় হরমোন কম উৎপাদিত হলে শুক্রাণু তৈরিতে সমস্যা হতে পারে।
জেনেটিক সমস্যা: ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোমের মতো কিছু জেনেটিক সমস্যায় প্রজননক্ষমতা কমতে পারে।
অণ্ডকোষের সমস্যা: জন্মের সময় অণ্ডকোষ যথাস্থানে না নামা পরবর্তী সময়ে শুক্রাণু উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।
শুক্রাণু বহনকারী নালিতে বাধা: জন্মগত সমস্যা, রোগ বা আঘাতের কারণে এসব নালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সংক্রমণ: ক্ল্যামাইডিয়া, গনোরিয়া বা প্রোস্টেটের প্রদাহের মতো সংক্রমণ প্রজননক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ভ্যারিকোসিল: অণ্ডকোষের শিরা ফুলে গেলে শুক্রাণুর উৎপাদন ও মান কমতে পারে।
অস্ত্রোপচার: অণ্ডকোষ বা হার্নিয়ার অস্ত্রোপচারের পরও কিছু ক্ষেত্রে প্রজননসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
মাদক ও ধূমপান: অতিরিক্ত মদ্যপান, ধূমপান, গাঁজা ও কোকেনের মতো মাদক শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।
স্থূলতা: অতিরিক্ত ওজন শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমিয়ে দিতে পারে।
কিছু ওষুধ: টেস্টোস্টেরন থেরাপি, অ্যানাবলিক স্টেরয়েড, কিছু ক্যানসারের ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক ও বিষণ্ণতার ওষুধও কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিরোধে করণীয়
পুরুষের বন্ধ্যত্বের সব কারণ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে শুক্রাণুর স্বাস্থ্য ভালো রাখা যেতে পারে।
অতিরিক্ত তাপ এড়িয়ে চলুন: দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরম পরিবেশে কাজ করলে মাঝেমধ্যে বিরতি নিন। দীর্ঘ সময় বসে থাকলে উঠে হাঁটাচলা করুন।
ঢিলেঢালা অন্তর্বাস পরুন: সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে খুব আঁটসাঁট অন্তর্বাস এড়িয়ে চলা যেতে পারে।
ধূমপান ও মাদক ছাড়ুন: সিগারেট, গাঁজা, কোকেন ও স্টেরয়েড থেকে দূরে থাকুন।
মদ্যপান কমান: অতিরিক্ত মদ্যপান শুক্রাণুর মান ও উর্বরতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সুষম খাবার খান: নিয়মিত ফল, সবজি, শিম, ডাল, দই, মাছ, ডিম ও মাংসের মতো পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকায় রাখুন।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: অতিরিক্ত ওজন থাকলে নিয়মিত শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর খাবারের মাধ্যমে ওজন কমানোর চেষ্টা করুন।
মানসিক চাপ কমান: দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ যৌন ইচ্ছা ও শুক্রাণু উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: এক বছর চেষ্টা করেও সন্তান না এলে শুধু নারী নয়, পুরুষেরও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা উচিত।
সমস্যা কতটা ব্যাপক?
বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা ও মান কমে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে পুরুষের বন্ধ্যত্বের সঠিক বৈশ্বিক পরিসংখ্যান নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ অনেক সমাজে বন্ধ্যত্বের বিষয়টি নিয়ে নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে আলোচনা ও চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কম।
তাই সন্তান ধারণে দীর্ঘদিন সমস্যা হলে কাউকে এককভাবে দায়ী না করে দুজনেরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।