বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সঙ্গে যে কটি লোকশিল্প ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, তার মধ্যে ‘নকশি কাঁথা’ অন্যতম প্রধান। এটি কেবল শীত নিবারণের সাধারণ কোনো চাদর বা বিছানা নয়; বরং এর প্রতিটি সুতোর ভাঁজে, ফোঁড়ের নিপুণতায় লুকিয়ে থাকে গ্রামীণ জনপদের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ এবং এক অলিখিত জীবনসংগ্রামের গল্প। গ্রামীণ নারীদের মনের গভীরে জমে থাকা অব্যাক্ত আবেগ যখন রঙিন সুতো হয়ে সাদা কাপড়ের বুকে ফুটে ওঠে, তখন তা রূপ নেয় এক জীবন্ত ক্যানভাসে। সাধারণ কাঁথার গায়ে যখন সূক্ষ্ম ও শৈল্পিক হাতছানি পড়ে, তখনই তা হয়ে ওঠে ‘নকশি কাঁথা’।

যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই অনন্য শিল্পকর্মটি আজ বিশ্বদরবারে বাঙালি সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল স্মারক হিসেবে সমাদৃত। bartabangla.com-এর পাঠকদের জন্য আজ তুলে ধরা হলো বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের আদিঅন্ত।
নকশি কাঁথার নামকরণ ও শেকড়ের ইতিহাস
‘নকশি কাঁথা’ শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রঙিন সুতোয় বোনা চমৎকার সব গ্রামীণ মোটিফ। তবে মজার বিষয় হলো, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এই পারিভাষিক শব্দটির বহুল ব্যবহার কিন্তু খুব বেশি প্রাচীন নয়। ১৯২৯ সালে কবি জসীমউদ্দীন তাঁর কালজয়ী রূপক কাব্যগ্রন্থ ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ প্রকাশ করার পর থেকে এই শব্দটি আমজনতার মাঝে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে।
কাঁথার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অঞ্চলভেদে এর উচ্চারণে ও নামকরণে বেশ বৈচিত্র্য রয়েছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে একে কোথাও ‘খেতা’ আবার কোথাও ‘কেন্থা’ নামে অভিহিত করা হয়। অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা এবং ভারতের বিহারের কিছু অঞ্চলে এই ধরনের নকশা করা বিশেষ কাঁথাকে ‘শুজনি’ নামে ডাকা হয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে এক সময় নকশা করা হোক বা না হোক, যেকোনো কাঁথাকেই সাধারণ অর্থে ‘কাঁথা’ বলা হতো। তবে বর্তমান সময়ে ওপার বাংলাতেও ‘নকশি কাঁথা’ শব্দটির প্রচলন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

সুতোর বুননে মিতব্যয়িতা : যেভাবে প্রাণ পায় একটি কাঁথা
বাঙালির নকশি কাঁথা মূলত গ্রামীণ মিতব্যয়িতা এবং সৃজনশীলতার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত। এটি তৈরির জন্য বাজার থেকে নতুন কোনো দামি কাপড় কিনতে হয় না। ঘরে থাকা পরিধানের পুরনো সুতি শাড়ি, লুঙ্গি কিংবা ধুতি দিয়েই এই কাঁথা তৈরি করা হয়। সাধারণত প্রয়োজন অনুযায়ী কাপড়ের পুরুত্ব ঠিক করতে তিন থেকে সাতটি শাড়ি একটির ওপর আরেকটি স্তরীভূত করে সাজানো হয়। এরপর সাধারণ ফোঁড়ের মাধ্যমে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ শুরু হয়। এই সেলাইগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন ছোট ছোট নদীর তরঙ্গের মতো বয়ে চলেছে।
কাঁথার নকশা তোলার ক্ষেত্রেও রয়েছে দারুণ এক কৌশল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাড়ির রঙিন পাড় থেকে অত্যন্ত যত্ন সহকারে সুতো তুলে নেওয়া হয় এবং সেই সুতো দিয়েই কাঁথার জমিনে পাড়ের অবিকল অনুকরণে নকশা তৈরি করা হয়। তবে অঞ্চলভেদে এর ব্যতিক্রমও চোখে পড়ে। যেমন রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে কাঁথা সেলাইয়ের জন্য কাপড় বোনার মূল সুতো সরাসরি ব্যবহার করা হয়, যা এই অঞ্চলের কাঁথাকে আলাদা এক বৈশিষ্ট্য দান করেছে।

সূচের জাদুতে ফোঁড়ের বৈচিত্র্য ও শিল্পরূপ
নকশি কাঁথার মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে এর ফোঁড়ের নিখুঁত কারুকাজে। উনিশ শতকের কিছু পুরনো কাঁথা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সে সময়ের লেখাপড়া না জানা গ্রামীণ নারীরা কাঁথাফোঁড়ের মাধ্যমে চমৎকার উদ্ভাবনী কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁদের হাতের জাদুতে কাঁথার বুকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৈরি হতো হালকা তরঙ্গ, রঙের এক মায়াবী ভুবন এবং বিচিত্র বর্ণের বিন্দুনকশা। এই বয়নভঙ্গি এতটাই নিখুঁত হতো যে, দেখলে মনে হতে পারে এটি কোনো হাতে সেলাই করা পণ্য নয়, বরং আধুনিক কোনো তাঁতে বোনা বস্ত্র।
কাঁথাফোঁড়ের বৈচিত্র্য অনুযায়ী এর প্রধান দুটি নাম রয়েছে—‘চাটাই বা পাটি ফোঁড়’ এবং ‘কাইত্যা ফোঁড়’। নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফোঁড়ের দৈর্ঘ্য কখনও বড় আবার কখনও ছোট করা হয়। এর বাইরে আরও দুই প্রকার বিখ্যাত কাঁথা হলো ‘পাড়তোলা কাঁথা’ এবং ‘লহরি বা লোহিরা কাঁথা’। পাড়তোলা কাঁথার পুরো শরীরেই শাড়ির পাড়ের ঢঙে নিখুঁত জ্যামিতিক নকশা করা হয়। অন্যদিকে লহরি কাঁথায় মোটা সুতো দিয়ে অত্যন্ত ঘন কারুকাজ করা হয়। এই ঘন বুননের কারণে পাড় ও নকশার মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গা থাকে না, যার ফলে পুরো কাঁথাটিকেই একটি আস্ত তাঁতের কাপড়ের মতো দেখায়।

নকশি কাঁথার মোটিফ : সুঁই-সুতায় আঁকা নারীর মনস্তত্ত্ব
একটি আদর্শ নকশি কাঁথার নকশায় একটি সুনির্দিষ্ট মূলনীতি বা ব্যাকরণ অনুসৃত হতে দেখা যায়। অধিকাংশ কাঁথার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে বা মাঝখানে একটি বড় ‘পদ্ম মোটিফ’ থাকে। এই পদ্মকে কেন্দ্র করে চারদিকে বৃত্তাকারে কতগুলো এককেন্দ্রিক বৃত্ত সাজানো থাকে, যা দেখতে নদীর তরঙ্গায়িত লতা কিংবা শাড়ির পাড়ের মতো মনে হয়।
কাঁথার চার কোণায় কিংবা কেন্দ্রীয় পদ্মের চতুর্দিকে বর্গাকৃতির যে নকশা থাকে, তার চার কোণায় গাছের মোটিফ বা ‘কল্কার নকশা’ করা হয়। এই কল্কাগুলোর মুখ সবসময় কেন্দ্রীয় পদ্ম মোটিফের দিকে ফেরানো থাকে।
কেন্দ্রীয় এবং কৌণিক মোটিফের মাঝখানের যে ফাঁকা জায়গা থাকে, তা মূলত শিল্পীর কল্পনা এবং বাস্তব জীবনের গল্প দিয়ে পূর্ণ করা হয়। গ্রামীণ খামার বাড়ি, মাঠের দৃশ্য, লোককাহিনীর দৃশ্য কিংবা বিভিন্ন পশুপাখির ছবি সেখানে স্থান পায়। কাঁথায় বহুল ব্যবহূত কিছু সাধারণ মোটিফ হলো:
- স্বস্তিকা ও কুলো
- হাতি, বাঘ, ঘোড়া ও ময়ূর
- নৌকা ও নৌকা বাইচের দৃশ্য
- জগন্নাথদেবের রথ ও লোকনৃত্য
- রাধা-কৃষ্ণসহ হিন্দু পুরাণের বিভিন্ন দৃশ্য (যেমন ফরিদপুরের একটি বিখ্যাত কাঁথায় গাছের ওপরে বসা নগ্ন নারীদের দৃশ্যের নিচে সেলাই করে লেখা হয়েছিল ‘বস্ত্রহরণ’)।

হৃদয়ের আবেগ, লৌকিক বিশ্বাস ও অক্ষরের মেলবন্ধন
নকশি কাঁথা তৈরির পেছনে গ্রামীণ নারীদের এক অদ্ভুত লৌকিক বিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে। মনে করা হয়, পুরনো কাপড়ের একটি অলৌকিক ক্ষমতা আছে, যা পরিবারের সদস্যদের ওপর কোনো কুদৃষ্টি বা নজর লাগা প্রতিহত করে। শুধু তাই নয়, কাঁথার এই মোটিফগুলোর মধ্য দিয়ে সূচিশিল্পীর সুখ, সমৃদ্ধি, বিবাহ এবং মাতৃত্বের গভীর আকাঙ্ক্ষা ও প্রার্থনা প্রতিফলিত হতো।
যদিও প্রাচীনকালের অধিকাংশ কাঁথা শিল্পীই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত ছিলেন, তবুও তাঁদের তৈরি কাঁথায় বাংলা অক্ষরে সুন্দর সুন্দর প্রবাদ, আশীর্বাণী বা মোটিফের শিরোনাম লিখে রাখার নজির রয়েছে। কোনো কোনো কাঁথায় জামাতাকে আশীর্বাদ করে লেখা থাকত – ‘সুখে থাকো’। আবার কোনো কোনো কাঁথায় শিল্পীর নিজস্ব স্বাক্ষর কিংবা যার জন্য কাঁথাটি তৈরি হচ্ছে, তাঁর নামও খোদাই করা থাকত। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গের ঠাকুরপুকুরের গুরুসদয় জাদুঘরে সংরক্ষিত একটি ঐতিহাসিক কাঁথায় স্পষ্ট লেখা রয়েছে যে, জনৈকা মানদাসুন্দরী তাঁর পরম পূজনীয় পিতার জন্য নিজ হাতে কাঁথাটি পরম যত্নে তৈরি করেছেন।

বিলুপ্তি থেকে গৌরবময় পুনরুজ্জীবন
বিশ শতকের প্রথম দিকে এসে বিশ্বজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক অভ্যুত্থান, কলকারখানায় তৈরি সস্তা জিনিসপত্রের প্রাচুর্য এবং মানুষের আধুনিক রুচির পরিবর্তনের কারণে এই শ্রমসাধ্য লোকশিল্পটি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে শুরু করে। মেকানিজমের যুগে মানুষ হাতের কাজের চেয়ে মেশিনের তৈরি লেপ বা চাদর ব্যবহারে বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
তবে আশার কথা হলো, বর্তমান বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে নিজস্ব লোকজ সংস্কৃতি ও নৃতাত্ত্বিক শিল্পকলার প্রতি মানুষের আগ্রহ নতুন করে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শহুরে মানুষের এই নস্টালজিয়া ও কদর গ্রামীণ কাঁথাশিল্পের পুনরুজ্জীবনে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি করেছে। আজ বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস ও বুটিক শপের কল্যাণে নকশি কাঁথা কেবল বিছানার চাদরেই আটকে নেই; তা শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া এবং গৃহসজ্জার আধুনিক উপাদানে রূপ নিয়ে বিশ্ববাজারে বাঙালির এক অনন্য ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।