মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ডামাডোলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সরাসরি জানিয়েছেন, ইরানের তেলশিল্পের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় ওয়াশিংটন।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রিত হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। আর এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, ওয়াশিংটন কেবল সামরিক বিজয় নয়, বরং ইরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড অর্থাৎ তেল খাতের দখল নিতে মরিয়া।

তেলের নিয়ন্ত্রণই অগ্রাধিকার
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর সাক্ষাৎকারে সাফ জানিয়েছেন, ইরানে তাঁর প্রধান লক্ষ্য হবে তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। তিনি এই পরিস্থিতির তুলনা করেছেন ভেনেজুয়েলার সাথে। উল্লেখ্য যে, গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার পর দেশটির তেলশিল্প নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের মতে, যারা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে তারা ‘বোকা’।
লক্ষ্যবস্তু যখন ‘খারগ দ্বীপ’
ইরানের মোট তেল রপ্তানির সিংহভাগই পরিচালিত হয় খারগ দ্বীপ থেকে। ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে এই দ্বীপটি দখল করতে হবে। যদিও এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়, তবুও ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসী যে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে খুব সহজেই এটি দখল করা সম্ভব। তবে সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এতে মার্কিন সেনা হতাহতের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
তেলের বাজারে অস্থিরতা
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের প্রভাব সরাসরি পড়েছে বিশ্ববাজারে। গত এক মাসে তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তেলের এই আকাশচুম্বী দাম বিশ্ব অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক তৎপরতা
পেন্টাগন ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ১০ হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে। এদের মধ্যে কয়েক হাজার মেরিন সেনা ইতিমধ্যে অঞ্চলে পৌঁছে গেছেন। সৌদি আরবের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের সাম্প্রতিক হামলার পর এই সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করা হয়েছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আলোচনার টেবিলে পাকিস্তান
আশ্চর্যের বিষয় হলো, একদিকে হামলার হুমকি দিলেও অন্যদিকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানের সাথে পরোক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান ‘উপহার’ হিসেবে পাকিস্তানের পতাকাবাহী ২০টি তেল ট্যাংকারকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। তিনি ৬ এপ্রিল পর্যন্ত ইরানকে সময় বেঁধে দিয়েছেন একটি চুক্তিতে আসার জন্য, অন্যথায় জ্বালানি খাতে ভয়াবহ হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, আগের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুর পর ইরানে বর্তমানে যারা শাসন করছেন তারা অনেক বেশি ‘পেশাদার’। তিনি আবারও দাবি করেছেন যে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হয়তো মারা গেছেন অথবা গুরুতর আহত। যদিও তেহরান এই দাবি বারবার প্রত্যাখ্যান করে আসছে, তবে মোজতবা খামেনির দীর্ঘ অনুপস্থিতি রহস্য আরও ঘনীভূত করছে।
শেষ কথা
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘তেল দখল’ করার এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এই আকাঙ্ক্ষা কেবল ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও এক বিরাট হুমকি। ৬ এপ্রিলের সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বিশ্ববাসী এখন উৎকণ্ঠার সাথে লক্ষ্য করছে, মধ্যপ্রাচ্য কি কোনো শান্তি চুক্তির দিকে যাবে, নাকি তেলের দখল নিয়ে শুরু হবে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ধ্বংসলীলা। ট্রাম্পের এই আগ্রাসী নীতি কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে ওলটপালট করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।