একটি নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আসার খবর পরিবারের জন্য পরম আনন্দের। কিন্তু এই আনন্দ অনেক সময় বিষাদে রূপ নেয় যখন প্রশ্ন ওঠে, ‘সন্তানটি ছেলে না মেয়ে?’ আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত পুত্রসন্তানের আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় অনাগত কন্যাশিশুর জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এই অন্ধকার দূর করতে এবং কন্যাশিশু হত্যার প্রবণতা রোধে ১১ মে সোমবার একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন বাংলাদেশের উচ্চ আদালত। হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, এখন থেকে গর্ভের সন্তানের লিঙ্গ শনাক্তকরণ বা পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। অনাগত শিশুর বেঁচে থাকার অধিকার এবং নারীর মর্যাদা রক্ষায় এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল।

১. হাইকোর্টের রায়ের মূল দিকসমূহ
বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেন। এর আগে ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আদালত সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেছিলেন। এই রায়ের মাধ্যমে লিঙ্গ নির্ধারণের অনৈতিক চর্চাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ক) বৈষম্যের অবসান
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, অনাগত শিশুর লিঙ্গ প্রকাশ করা নারীর প্রতি বৈষম্যকে সরাসরি উৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রে লিঙ্গ জানার পর কন্যাশিশু হলে গর্ভপাতের মতো নিষ্ঠুর পথ বেছে নেওয়া হয়, যা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।
খ) সাংবিধানিক ও মানবাধিকার রক্ষা
রায়ে বলা হয়, লিঙ্গ শনাক্তকরণ আমাদের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতারও লঙ্ঘন। অনাগত শিশুর জীবনের অধিকার এবং মায়ের মর্যাদাকে এখানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
২. কেন এই নিষেধাজ্ঞা জরুরি ছিল?
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে গর্ভবতী মায়েদের আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানোর সময় লিঙ্গ জানার এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ করা গেছে। চিকিৎসকদের ওপর পারিবারিক চাপ সৃষ্টি করা এবং কন্যা সন্তান জানলে মায়ের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানোর ঘটনা আমাদের সমাজে বিরল নয়।
- কন্যাশিশু হত্যা প্রতিরোধ: লিঙ্গ শনাক্তকরণ বন্ধ হলে কন্যা ভ্রূণ হত্যার হার নাটকীয়ভাবে কমে আসবে।
- সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা: একটি সুস্থ সমাজের জন্য নারী-পুরুষের অনুপাত ঠিক থাকা জরুরি। এই রায় সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাবে।
- মানসিক স্বস্তি: লিঙ্গ জানার অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেয়ে মা নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি বেশি মনোযোগী হতে পারবেন।
৩. মনিটরিং ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব
আদালত কেবল নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং এটি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন। পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আগে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব থাকায় এই অনৈতিক চর্চাটি মহামারীর মতো ছড়িয়েছে।
- ডিজিটাল নজরদারি: হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তদারকি করতে হবে।
- কঠোর নীতিমালা: ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ বন্ধে কেবল গাইডলাইন নয়, বাস্তবায়নযোগ্য নীতিমালা প্রণয়ন বাধ্যতামূলক।
- জবাবদিহিতা: কোনো ক্লিনিক বা চিকিৎসক এই আইন লঙ্ঘন করলে তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
৪. আইনজীবী ইশরাত হাসানের লড়াই
এই জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট রিটটি করেছিলেন অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে গর্ভের শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ রোধে নীতিমালা তৈরির দাবিতে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছিলেন। হাইকোর্টের এই রায়কে তিনি ঐতিহাসিক জয় হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং মনে করেন এর ফলে দেশে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
৫. আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও আমাদের অবস্থান
ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশেই গর্ভের সন্তানের লিঙ্গ প্রকাশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। দেরিতে হলেও বাংলাদেশ এই পথে হাঁটা শুরু করায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে। এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনেও সহায়ক হবে।
উপসংহার: সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায়
সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, সে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে আসার অধিকার রাখে। হাইকোর্টের এই রায় কেবল একটি আইনি নির্দেশ নয়, এটি আমাদের মানসিকতা পরিবর্তনের একটি ডাক। চিকিৎসক, অভিভাবক এবং রাষ্ট্রযন্ত্র যদি সম্মিলিতভাবে এই রায় বাস্তবায়ন করতে পারে, তবেই আমাদের অনাগত শিশুরা একটি বৈষম্যহীন পৃথিবী পাবে। গর্ভাশয় হোক পরম নিরাপদ স্থান, সেখানে লিঙ্গের বিচারে কারো জীবন যেন থেমে না যায়।