বিয়ে প্রতিটি মানুষের জীবনেই এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। বিশেষ করে কনের জন্য এটি অত্যন্ত আবেগঘন এবং প্রত্যাশার একটি মুহূর্ত। তবে ভারতের ছত্তিশগড়ে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা বিয়েবাড়ির আনন্দকে মুহূর্তেই এক সাহসী সামাজিক বিপ্লবে রূপ দিয়েছে। ছত্তিশগড়ের জাঞ্জগির-চম্পা জেলায় গত ২৩ জুন এক বিয়ের আসরে অতিরিক্ত মদ্যপ অবস্থায় হাজির হন বর। বরের এমন চূড়ান্ত মাতলামি ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ দেখে মণ্ডপেই বিয়ে ভেঙে দেওয়ার এক নজিরবিহীন ও সাহসী সিদ্ধান্ত নেন ২২ বছর বয়সী তরুণী মুসকান প্রধান। মাদক ও মদ্যপানের বিরুদ্ধে এমন দৃঢ় ও অনুকরণীয় অবস্থান নেওয়ার কারণে পরবর্তীতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ওই তরুণীকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছে।

শুভ লগ্ন যখন মাতলামির আসর
ভারতের ছত্তিশগড়ের জাঞ্জগির-চম্পা জেলার বাসিন্দা ২২ বছরের তরুণী মুসকান প্রধান। পাত্র ২৪ বছর বয়সী যুবক সন্তরাম। ধুমধাম করে দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছিল। ২৩ জুন বিকেল ৪টার দিকে বরযাত্রী নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছান বর সন্তরাম। চারদিকে তখন সানাইয়ের সুর আর উৎসবের আমেজ।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতেই কনে ও কনেপক্ষের চোখ কপালে ওঠে। বর সন্তরাম এতটাই মদ্যপ বা মাতাল অবস্থায় ছিলেন যে, তিনি ঠিকমতো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন। মণ্ডপে বসে অসংলগ্ন আচরণ আর মাতলামি করতে শুরু করেন তিনি। একটি পবিত্র সামাজিক বন্ধনের শুরুতে বরের এমন রূপ দেখে হতবাক হয়ে যান উপস্থিত সবাই।
মুসকানের সাহসী সিদ্ধান্ত ও পুরোনো প্রতিশ্রুতির ভাঙন
দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা মুসকান প্রধান এই দৃশ্য দেখে এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এই মদ্যপ যুবকের গলায় মালা দিতে এবং তার সঙ্গে জীবনের নতুন ইনিংস শুরু করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ঘোষণা করেন, এমন মাতাল মানুষের সঙ্গে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন না এবং এই বিয়ে এখানেই সমাপ্ত।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুসকান জানান, এই বরের সঙ্গে তাঁর বিয়ে ভাঙার পেছনে একটি পূর্ব ইতিহাসও ছিল। এর আগে তাঁদের বাগদান বা আংটি বদলের দিনও সন্তরাম একইভাবে মদ্যপ অবস্থায় অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। তখন মুসকান বিষয়টি সহজভাবে নেননি এবং সন্তরামকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছিলেন। সে সময় সন্তরাম ভবিষ্যতে আর কখনো মদ না খাওয়ার এবং ভালো হয়ে যাওয়ার পবিত্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনেও যখন সন্তরাম নিজের নেশার মোহ ত্যাগ করতে পারলেন না এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলেন, তখন মুসকান বুঝতে পারেন যে এই মানুষের সঙ্গে তাঁর ভবিষ্যৎ কখনোই নিরাপদ হতে পারে না।
মণ্ডপে উত্তেজনা, সংঘর্ষ এবং পুলিশের হস্তক্ষেপ
মুসকানের এই অটল ও সাহসী সিদ্ধান্তের পর বিয়েবাড়ির আনন্দঘন পরিবেশ মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। কনেপক্ষের এই আকস্মিক প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে পারেনি বরপক্ষ। ফলে দুই পরিবারের সদস্য এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কথার পিঠে কথা চলতে চলতে একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল মারামারি ও সংঘর্ষ বেধে যায়।
পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে বিশেষ সম্মাননা ও সামাজিক বার্তা
মুসকানের এই অকুতোভয় পদক্ষেপ কেবল একটি বিয়ে ভাঙার ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি পুরো সমাজের জন্য একটি জোরালো বার্তা হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২৫ জুন (বৃহস্পতিবার) জাঞ্জগির-চম্পা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) বিজয় কুমার পান্ডে ওই তরুণীকে তাঁর কার্যালয়ে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানান।
স্থানীয় বিশিষ্ট সমাজকর্মী, নারী নেত্রী এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এসপি বিজয় পান্ডে মুসকান প্রধানকে তাঁর অসীম সাহসিকতার জন্য বিশেষভাবে সম্মানিত করেন এবং তাঁর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে এসপি বিজয় পান্ডে বলেন, “মুসকান সমাজের সামনে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এই ঘটনা সমাজে মদ্যপানের বিরুদ্ধে একটি জোরালো ও স্পষ্ট বার্তা দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, বিয়েতে কেবল সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান, সততা ও দায়িত্বশীলতার গুরুত্ব কতটা অপরিসীম। মুসকানের এই সিদ্ধান্ত অন্যান্য নারীদেরও নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেতন ও সাহসী করে তুলবে।”