বাংলাদেশে নতুন পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এর ফলে দুর্নীতি হ্রাস এবং সেবার মান বাড়বে কি না, সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদদের মতে, বেতনের সঙ্গে সেবার মান বাড়লে তেমন সমস্যা হবে না। তবে সেবার মান বৃদ্ধি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, এ খাতে নতুন করে সরকারের এক লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হবে। এর বিপরীতে কোনো প্রত্যক্ষ রিটার্ন আসবে না। সেবার মান বাড়বে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক-উভয় দিক থেকেই সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলো কর্মদক্ষতা ও সেবার মান বাড়াতে পারলে উচ্চতর বেতন অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে না।

সংস্থাটির আরেকজন সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা রয়েছে। কিন্তু দুর্বল রাজস্ব আহরণ ও বড় বাজেট ঘাটতির মধ্যে অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ঋণ বা টাকা ছাপানো হলে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হতে পারে। ফলে এখন মূল বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত কীভাবে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়ন করে আর্থিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। প্রসঙ্গত, সোমবার নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে মন্ত্রিপরিষদ। বেতন ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘প্রশ্ন হলো-এই সময় এতগুলো টাকা জনগণের পকেট থেকে দিতে হবে। আগে যদি ১০০ টাকা দিতে পারত, এখন ২০০ টাকা দিতে হবে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতনের জন্য। অর্থাৎ ১০০ শতাংশের বেশি, ১৪০ শতাংশের মতো। পেনশনও বেড়ে যাবে। তাদের সারা জীবন খুব ভালো চলবে। কিন্তু জনগণ কী পাবে?’ তিনি বলেন, ‘সেবার মান তো বাড়ছে না। কিছুই বাড়বে না। তাহলে কেন এই ব্যয়টা জনগণ বহন করবে।’ তার মতে, এখানে আদান-প্রদান হওয়া উচিত ছিল। যারা বেশি বেতন পাবেন, তাদের সেবার মানও বাড়াতে হবে। না হলে তাদের একটা দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।
তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের হিসাব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, এটাও তো তারা আমলে নিল না। সরকারি কর্মকর্তারা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তাদের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করতে পারে না। ঘুস খেয়ে তারা লাল হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করা যাবে না। সরকারের অনুমোদন ছাড়া মামলা করা যাবে না।
সাবেক এই গভর্নর বলেন, ‘বেতন বাড়বে, আপত্তি নেই। তবে প্রক্রিয়াটিকে শক্তিশালী করা উচিত ছিল। অর্থাৎ প্রশাসনকে আরও শক্তিশালীভাবে, কাঠামোগতভাবে উন্নয়ন করে তারপর বেতন বাড়ানো উচিত ছিল। সেটা হয়নি। ফলে এই বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণ কিছু পাচ্ছে না।’
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি সচিবালয়ে বলেন, সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সংকট কমলে দুর্নীতির প্রবণতাও কমতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় হলেও দুর্নীতি কমানোর জন্য এটি যথেষ্ট নয়।
এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন না থাকলে সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাগত উৎকর্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা আশা করা কঠিন। কিন্তু শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে-এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। তিনি নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্ত করার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদবিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত। শুধু নিজের নয়, পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয় ও সম্পদের হিসাবও প্রতিবছর হালনাগাদ করতে হবে।
উল্লেখ্য, নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বেড়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। সর্বনিম্ন গ্রেডে বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ, আর সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ। প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক সরকারি কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী এর আওতায় আসবেন। নবম পে-স্কেল মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হওয়ার পর সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। দ্বিগুণেরও বেশি বেতন বাড়ায় তাদের মধ্যে স্বস্তি নেমে এসেছে।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং খেটে খাওয়াসহ দেশের ১৮ কোটি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।