বিশ্বজুড়ে অন্য যেকোনো ক্যানসারের চেয়ে ফুসফুসের ক্যানসারেই (Lung Cancer) প্রতিবছর সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এত অগ্রগতির পরও আক্রান্তদের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ রোগ নির্ণয়ের পর পাঁচ বছরের বেশি বাঁচতে পারেন না। তবে সম্প্রতি চিকিৎসা জগতে এক বৈপ্লবিক আবিষ্কারের তথ্য সামনে এসেছে। বিজ্ঞানীরা রক্তে এমন এক উপাদানের সন্ধান পেয়েছেন, যা ক্যানসার হওয়ার অন্তত ৫ বছর আগেই অত্যন্ত নির্ভুলভাবে এর পূর্বাভাস দিতে সক্ষম।
বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সেল’ (Cell)-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি ফুসফুসের ক্যানসার নিরাময়ের চেয়ে তা পুরোপুরি ‘প্রতিরোধ’ করার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

৮০ জন গবেষক ও রক্তের ১৪টি প্রোটিনের ম্যাজিক
চারটি মহাদেশের ৮০ জনেরও বেশি প্রখ্যাত গবেষকের একটি দল এই গবেষণায় অংশ নেন। যুক্তরাজ্যের ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের অনকোলজিস্ট ও ক্লিনিকাল ডিরেক্টর ড. চার্লস সোয়ানটনের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা ‘ইউকে বায়োব্যাংক’ থেকে প্রায় ৪৮ হাজার রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন।
এরপর অত্যাধুনিক ‘মেশিন লার্নিং’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা রক্তের মধ্যে এমন ১৪টি সুনির্দিষ্ট প্রোটিন শনাক্ত করেছেন, যা মানবশরীরে ফুসফুসের ক্যানসার তৈরির প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত। রোগীর বয়স, ধূমপানের ইতিহাস ও ফুসফুসের অন্যান্য রোগের ডেটার সাথে যখন এই প্রোটিনগুলোর উপস্থিতি মেলানো হয়, তখন তা বর্তমানে প্রচলিত যেকোনো স্ক্রিনিং ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুলভাবে ক্যানসারের পূর্বাভাস দিতে পারে। এমনকি যারা কখনো ধূমপান করেননি, তাদের ক্ষেত্রেও এই প্রোটিন সিগনেচার বা বৈশিষ্ট্যটি দারুণ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
ধূমপান, বায়ুদূষণ ও প্রদাহের এক বিষাক্ত চক্র
ইঁদুর এবং কোষের মডেল ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, ধূমপান এবং চারপাশের অনিয়ন্ত্রিত বায়ুদূষণ মানবশরীরে এক ধরনের বিশেষ প্রদাহজনিত পথ সক্রিয় করে তোলে। এই পথটি সক্রিয় হলেই রক্তে ওই ১৪টি প্রোটিনের ঘনত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে।
গবেষকদের মতে, শুধু জেনেটিক মিউটেশন বা বংশগত পরিবর্তনের কারণেই ফুসফুসের ক্যানসার হয় না। বরং ধূমপান ও দূষণ শরীরে যে তীব্র ‘প্রদাহ’ সৃষ্টি করে, তা-ই ক্যানসার কোষ তৈরিতে মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। মজার বিষয় হলো, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD) এবং পালমোনারি ফাইব্রোসিসের মতো ফুসফুসের অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্তদের রক্তেও এই প্রোটিনগুলোর উচ্চ উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, এই তিনটি প্রাণঘাতী রোগের উৎস মূলেই রয়েছে এই সাধারণ প্রদাহজনিত পরিবেশ।
ক্যানাকিনুম্যাব: ক্যানসার প্রতিরোধের নতুন হাতিয়ার?
প্রদাহ যেহেতু ক্যানসার রূপ নেওয়ার আগেই শরীরে বাসা বাঁধে, তাই এটিকে শুরুতেই ধ্বংস করার উপায় খুঁজছিলেন বিজ্ঞানীরা। সেই সূত্র ধরে গবেষকেরা ‘ক্যানাকিনুম্যাব’ (canakinumab) নামক একটি প্রচলিত অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বা প্রদাহবিরোধী ওষুধের ট্রায়াল ডেটা পর্যালোচনা করেন।
ক্যানাকিনুম্যাব (Canakinumab) ওষুধের কার্যকারিতা:
ক্যানাকিনুম্যাব মূলত ব্যবহৃত হয়: হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে।
লক্ষ্যবস্তু: রক্তে ক্যানসার সৃষ্টিকারী ওই ১৪টি প্রোটিনের প্রদাহজনিত পথ।
ফলাফল: উচ্চ প্রোটিনযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ৫০% বা অর্ধেক কমিয়ে দেয়।
ড. সোয়ানটন এই আবিষ্কারের সম্ভাবনাকে হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘স্ট্যাটিন’ ওষুধের সাথে তুলনা করেছেন। যেমন চিকিৎসকেরা রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল দেখে স্ট্যাটিন দেন এবং হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করেন; ঠিক তেমনি এই রক্ত পরীক্ষা দেখে ওষুধ দিয়ে ফুসফুসের ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
বড় কিছু ‘যদি’ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি
এই আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের আশাবাদী করলেও সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় এটি ব্যবহারের আগে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে: ১. ক্লিনিকাল ট্রায়াল: ফুসফুসের ক্যানসার প্রতিরোধে এই ওষুধটি পুরোপুরি নিরাপদ কি না, তা জানতে বিজ্ঞানীদের আরও বড় পরিসরে মানবদেহে নিয়ন্ত্রিত ট্রায়াল চালাতে হবে। ২. পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের পালমোনোলজিস্ট ড. পিটার ম্যাজোনের মতে, ক্যানাকিনুম্যাব ওষুধের কারণে শরীরে সেপসিস বা মারাত্মক ইনফেকশনের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তাই এর ক্ষতিকর দিকগুলোও খতিয়ে দেখা জরুরি।
উপসংহার: প্রতিরোধের নতুন সূর্যোদয়
ইয়েলে স্কুল অব মেডিসিনের ড. রয় এস হার্বস্ট বলেন, তাঁর দীর্ঘ ৩০ বছরের কর্মজীবনে তিনি ফুসফুসের ক্যানসারকে একটি নিরাময় অযোগ্য রোগ থেকে চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময়যোগ্য অবস্থায় পরিবর্তিত হতে দেখেছেন। তবে এই রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় জয় তখনই আসবে, যখন একে একদম প্রাথমিক পর্যায়ে বা হওয়ার আগেই রুখে দেওয়া যাবে।
রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যা চিহ্নিত করে সিটি স্ক্যান বা প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা সম্ভব হলে লাখ লাখ প্রাণ বাঁচানো যাবে। এই গবেষণাটি হয়তো রাতারাতি সব বদলে দেবে না, তবে এটি নিশ্চিতভাবেই ক্যানসারমুক্ত পৃথিবীর দিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক ঐতিহাসিক ও দৃঢ় পদক্ষেপ।